উচ্চ রক্তচাপকে অনেকেই শুধুমাত্র হৃদ্রোগ বা হার্ট অ্যাটাকের কারণ হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ শরীরের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের জন্যই বড় হুমকি। এটি ধীরে ধীরে রক্তনালিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং এর প্রভাব পড়ে মস্তিষ্ক, কিডনি, চোখসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে। এ কারণেই উচ্চ রক্তচাপকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়।
মস্তিষ্কের জন্য বড় ঝুঁকি
দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মস্তিষ্কের রক্তনালিগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। এর ফলে রক্তনালি ফেটে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা হেমোরেজিক স্ট্রোক হতে পারে। শুধু তাই নয়, দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ রক্তচাপ মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম কোষগুলোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, মনোযোগের ঘাটতি এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
কিডনির কার্যক্ষমতা নষ্ট করতে পারে
কিডনি শরীরের রক্ত পরিশোধনের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনির ভেতরের সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে রক্ত পরিশোধনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমতে থাকে এবং একপর্যায়ে কিডনি বিকলের মতো জটিল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
দৃষ্টিশক্তিও হারানোর আশঙ্কা
চোখের রেটিনা অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি অংশ, যেখানে অসংখ্য ক্ষুদ্র রক্তনালি রয়েছে। উচ্চ রক্তচাপের কারণে এসব রক্তনালিতে ক্ষতি বা রক্তক্ষরণ হলে দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী দৃষ্টিহানির কারণও হতে পারে।
রক্তনালির ক্ষতি ও অন্যান্য জটিলতা
উচ্চ রক্তচাপ শরীরের ধমনিগুলোকে ধীরে ধীরে শক্ত ও সংকুচিত করে ফেলে, যা অ্যাথেরোস্কলেরোসিস নামে পরিচিত। এতে রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয় এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি পায় না। ফলে হৃদ্রোগ, স্ট্রোকসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
তরুণদেরও সতর্ক হতে হবে
একসময় উচ্চ রক্তচাপকে বয়স্কদের রোগ মনে করা হলেও বর্তমানে পরিস্থিতি বদলে গেছে। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং মানসিক চাপের কারণে তরুণদের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপ দ্রুত বাড়ছে। তাই ১৮ বছর বয়সের পর থেকেই নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে পরিবারে উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলে আরও বেশি সতর্ক থাকা জরুরি।
প্রতিরোধেই সুরক্ষা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত লবণ পরিহার করতে হবে, শরীরের ওজন স্বাভাবিক রাখতে হবে এবং নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা ৬ থেকে ৭ হাজার পদক্ষেপ চলাফেরা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই এর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। তাই সুস্থ থাকার জন্য নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণের বিকল্প নেই। সচেতনতা ও সময়মতো পদক্ষেপই পারে হৃদ্যন্ত্র, মস্তিষ্ক, কিডনি ও চোখকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে।









