মানুষের জীবন কখনোই সবসময় একরকম থাকে না। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের পাশাপাশি দুঃখ, কষ্ট, সংকট ও নানা পরীক্ষার মধ্য দিয়েও মানুষকে অতিক্রম করতে হয়। এসব পরিস্থিতিতে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েন, কেউ অভিযোগে ব্যস্ত হয়ে যান, আবার কেউ মানুষের কাছে সমাধান খুঁজতে থাকেন। কিন্তু ইসলাম একজন মুমিনকে ভিন্ন শিক্ষা দেয়। বিপদে একজন মুমিনের প্রথম করণীয় হলো মহান আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া এবং তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করা।
আল্লাহর কাছেই দুঃখ প্রকাশ
পবিত্র কোরআনে হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর জীবনে আমরা এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। প্রিয় সন্তান হজরত ইউসুফ (আ.)-এর বিচ্ছেদে দীর্ঘদিন শোকাহত থাকলেও তিনি মানুষের কাছে অভিযোগ করেননি। বরং বলেছিলেন, “আমি আমার দুঃখ ও বেদনার কথা শুধু আল্লাহর কাছেই পেশ করছি।” (সুরা ইউসুফ: ৮৬)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, একজন মুমিনের হৃদয় যখন কষ্টে ভারী হয়ে ওঠে, তখন তার প্রথম আশ্রয় হওয়া উচিত আল্লাহর দরবার। কারণ মানুষের সহানুভূতি সীমিত হলেও আল্লাহর রহমত ও করুণা সীমাহীন।
অভিযোগ নয়, ধৈর্য ও দোয়া
বিপদের সময় অনেক মানুষ ভাগ্য, পরিবেশ বা অন্য মানুষকে দায়ী করে। কিন্তু অভিযোগ কখনো সমস্যার সমাধান করে না। ইসলাম মানুষকে ধৈর্য ধারণ এবং দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনার শিক্ষা দেয়।
হজরত আইয়ুব (আ.) দীর্ঘদিন রোগ ও কষ্টে আক্রান্ত থেকেও ধৈর্য হারাননি। তিনি বিনয়ের সঙ্গে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, “হে আমার প্রতিপালক, আমাকে কষ্ট স্পর্শ করেছে, আর আপনি তো সর্বাধিক দয়ালু।” (সুরা আম্বিয়া: ৮৩)
এই দোয়ার মাধ্যমে তিনি নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছিলেন এবং আল্লাহর রহমতের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছিলেন। আল্লাহও তাঁর ধৈর্যের প্রতিদান দিয়েছেন।
নামাজ ও দোয়ার মাধ্যমে সাহায্য চাওয়া
বিপদের সময় নামাজ একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি। কোরআনে আল্লাহ তাআলা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাইতে নির্দেশ দিয়েছেন। নামাজ মানুষের অন্তরে প্রশান্তি সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ককে দৃঢ় করে।
বিশেষ করে সিজদার মুহূর্তে বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী থাকে। তাই হৃদয়ের কষ্ট, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার কথা আল্লাহর কাছে তুলে ধরার উত্তম সময় হলো সিজদা।
আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা
বিপদে মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব হলো আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং তাঁর ওপর ভরসা রাখা। পবিত্র কোরআনে এসেছে, “আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।” (সুরা তালাক: ৩)
এই বিশ্বাস একজন মুমিনকে হতাশা থেকে রক্ষা করে। সে জানে, প্রতিটি কষ্টের পেছনেই আল্লাহর কোনো না কোনো হিকমত রয়েছে এবং প্রতিটি সংকটের পরই রয়েছে স্বস্তি।
আত্মসমালোচনা ও তওবা
বিপদ-আপদ মানুষের জন্য আত্মসমালোচনারও সুযোগ এনে দেয়। একজন মুমিন এ সময় নিজের ভুলত্রুটি পর্যালোচনা করে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করে। কারণ অনেক সময় পরীক্ষা মানুষের ঈমানকে আরও শক্তিশালী ও পরিশুদ্ধ করার মাধ্যম হয়ে ওঠে।
উপসংহার
বিপদে একজন মুমিনের প্রথম করণীয় হলো আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া, তাঁর কাছে নিজের দুঃখ-কষ্ট তুলে ধরা এবং ধৈর্য ও দোয়ার মাধ্যমে সাহায্য কামনা করা। অভিযোগ, হতাশা বা অস্থিরতার পরিবর্তে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাই একজন প্রকৃত মুমিনের পরিচয়। কারণ মানুষের সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও মহান আল্লাহর রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না। তাই জীবনের যেকোনো সংকটে একজন মুমিনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় একমাত্র তাঁর রব।









