ডিজিটাল যুগে শিক্ষা ব্যবস্থার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে। বিশেষ করে বৈশ্বিক মহামারি COVID-19 এর সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনলাইন শিক্ষা হয়ে ওঠে একমাত্র বিকল্প। তবে এই সুবিধাজনক ব্যবস্থার আড়ালে ক্রমেই বাড়ছে শিক্ষার্থীদের ডিভাইস-নির্ভরতা ও আসক্তির প্রবণতা, যা এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
অনলাইন ক্লাসের জন্য স্মার্টফোন, ট্যাব বা কম্পিউটার ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ক্লাসের নাম করে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে ডিভাইস ব্যবহার করছে, যার একটি বড় অংশই পড়াশোনার বাইরে বিনোদনমূলক কাজে ব্যয় হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম এবং ভিডিও কনটেন্টে অতিরিক্ত সময় ব্যয় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও একাগ্রতা নষ্ট করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প বয়সে অতিরিক্ত ডিভাইস ব্যবহারের ফলে মানসিক ও শারীরিক নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন—ঘুমের ব্যাঘাত, চোখের সমস্যা, উদ্বেগ, এমনকি পড়াশোনার প্রতি অনীহাও তৈরি হতে পারে। অনেক শিক্ষার্থী বাস্তব সামাজিক যোগাযোগ থেকে দূরে সরে গিয়ে ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, যা তাদের ব্যক্তিত্ব গঠনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অভিভাবকদের জন্যও বিষয়টি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা অনেক সময় বুঝতে পারেন না, সন্তান আসলেই ক্লাস করছে নাকি অন্য কোনো কাজে ডিভাইস ব্যবহার করছে। তদারকির অভাব ও সচেতনতার ঘাটতি এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
অন্যদিকে, শিক্ষকদের জন্যও এটি একটি জটিল পরিস্থিতি। অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা এবং তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা তুলনামূলকভাবে কঠিন। ফলে শিক্ষার মান বজায় রাখা অনেক সময় চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে ডিভাইস ব্যবহার, এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বনিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলার শিক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও আকর্ষণীয় ও ইন্টারেক্টিভ অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় আগ্রহী থাকে।
সবশেষে বলা যায়, অনলাইন ক্লাস আধুনিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলেও এর অন্তরালে লুকিয়ে থাকা ডিভাইস আসক্তির সমস্যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা গেলে ডিজিটাল শিক্ষা সত্যিকার অর্থেই কল্যাণকর হয়ে উঠবে।
লেখকঃ সিনিয়র শিক্ষক, শাহপিন উচ্চ বিদ্যালয়, ভোগশাইল, বিশ্বনাথ, সিলেট।









