চলতি বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বাড়াতে পোস্টার নিষিদ্ধ, দলীয় প্রতীক বাতিল, ইভিএম ব্যবহার না করা, পোস্টাল ভোট বন্ধ এবং প্রার্থীদের জামানত বাড়ানোর মতো একাধিক পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সাংবিধানিক সংস্থাটি।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন—এই পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সম্প্রতি বলেছেন, বর্ষা মৌসুম শেষে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে নির্বাচন শুরু হতে পারে।
তবে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সেপ্টেম্বরের পরিবর্তে অক্টোবরের শেষ ভাগ কিংবা নভেম্বরের শুরুতে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে কমিশন বেশি আগ্রহী। কারণ বর্ষাকালে দেশের অনেক এলাকায় ভোটগ্রহণ পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, সেপ্টেম্বরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বর্ষার প্রভাব থাকে। হাওরাঞ্চলসহ অনেক অঞ্চলে ওই সময়ে নির্বাচন আয়োজন বাস্তবিকভাবেই চ্যালেঞ্জিং। তাই নভেম্বরের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর সম্ভাবনা কম।
কোন স্তরের নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে কার্যক্রম শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মতে, কোন নির্বাচন আগে হবে, তার চেয়ে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কমিশনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দেশের ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৫০০ উপজেলা পরিষদ, ৬১ জেলা পরিষদ, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং ৩৩০টি পৌরসভার নির্বাচন আয়োজন একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সংঘাত ও রক্তপাতমুক্ত নির্বাচন আয়োজন করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একাধিক পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পোস্টারবিহীন প্রচারণা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার না করা এবং দেশে-বিদেশে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্তের দিকেও এগোচ্ছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। এতে দলীয় পরিচয়ে কোনো প্রার্থী নির্বাচন করতে পারবেন না। একই সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য বিদ্যমান ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ফেরারি আসামিদের অযোগ্য ঘোষণার পাশাপাশি প্রার্থীদের জামানত ও নির্বাচনি ব্যয়ের সীমা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া জাতীয় নির্বাচনে চালু থাকা অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও বাতিল করা হতে পারে। এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিধিমালা সংশোধনের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পোস্টার থাকবে না, ইভিএম ব্যবহার করা হবে না এবং কোনো ধরনের পোস্টাল ভোটের ব্যবস্থাও রাখা হবে না। নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন আয়োজনের ফলে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না এবং সবাই স্বতন্ত্র পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন।
তিনি জানান, প্রার্থীদের জামানত ও নির্বাচনি ব্যয়ের সীমা বাড়ানোর বিষয়ে কমিশনের নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। তবে জামানতের পরিমাণ কত হবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের প্রভাব বিস্তার রোধে কিছু বিধান নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে সংসদ সদস্যদের কার্যক্রমের বিষয়টি কমিশনের বিবেচনায় রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে আয়োজন করা হবে। ফলে প্রতিটি ধাপে প্রয়োজনীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা সহজ হবে। আপাতত সেনাবাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা না থাকলেও পরিস্থিতির প্রয়োজন হলে পরবর্তী ধাপে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের আশা, স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত বিধিমালা সংশোধনের কাজ আগামী জুনের মধ্যেই শেষ হবে। এরপর নতুন বিধিমালার আলোকে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হবে।








