বিশ্বনাথের প্রথম অনলাইন পত্রিকা

বাবা-মেয়ের স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল…

নিজস্ব প্রতিবেদক :: ইউক্রেন থেকে ফ্রান্স যাওয়ার পথে স্লোভাকিয়ায় নিহত হন সিলেটের বিশ্বনাথের সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দিন আহমদ (৩৫)। তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। রেখে গেছেন তিন বছর বয়সী একমাত্র শিশু কন্যা ইরা তাসফিয়া, স্ত্রী শিরিনা সুলতানা সহ বাবা ও ভাই-বোনদের। ইরা তাসফিয়া এখনো জানে তার বাবা আর পৃথিবীতে বেঁচে নেই। আদরের মেয়ে ইরা’কে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন ফরিদ। সেই স্বপ্ন পুরণে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন প্রবাসে। কিন্ত আজ সব স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেছে। তবুও ফরিদের রেখে যাওয়া স্বপ্ন পুরণে মেয়ে ইরা তাসফিয়াকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চান স্কুল শিক্ষিকা স্ত্রী শিরিনা সুলতানা। সম্প্রতি স্বামী ফরিদ উদ্দিন আহমদকে নিয়ে শিরিনা সুলতানা তার ফেসবুকে আইডিতে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেই স্ট্যাটাসে তিনি করেছেন স্মৃতিচারণ, চেয়েছেন দোয়া।
ফেসবুকে শিরিনা সুলতানার সেই স্ট্যাটাসটি বিশ্বনাথ নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম -এর পাঠকদের জন্য হুবহু এখানে তুলে ধরা হলো-

আল্লাহ সর্বশক্তিমান
আমার ফরিদ (জীবনসঙ্গী)। বলা যায় একজন ইউনিক পার্সন নতুবা একজন ম্যাজিকম্যান। ম্যাজিকের মতো মানুষের সাথে মিশবার/মানুষের ভালোবাসা আদায়ের কিছু অসাধারণ ক্ষমতা ছিলো ওর। ১৩ বছর থেকে মাতৃহীন তবে সবার অতি স্নেহের অত্যন্ত প্রানবন্ত প্রানচঞ্চল। যার দরুন আমিও ছিলাম ভাগ্যবতী। পাখির মত জীবন ছিল আমাদের আর ভালোবাসায় পূর্ণ। আমার ব্রেইন খুশিতে ভরপুর থাকতো। কুঁড়ে ঘরে রাণীর মতই ছিলাম। জীবনটাকে উপভোগ করেছি (আল্লাহকে ভুলিনি)। কিন্তু জানতামনা এই সুখ মাত্র ৫ বছর কপালে লিখা ছিলো। কেমন মোহাচ্ছন্নের মতো কেটে গেছে দিনগুলো। ৫ বছরে যা পেয়েছি জানিনা কতটা মেয়ে সারাজীবনে তা পায়।
বাবাও তো অনেক দেখেছি তবে আমার মেয়ের বাবাটা ছিলো একেবারই আলাদা। দেড় বছর মেয়েকে নিজ হাতে লালন করেছেন, তাদের বাবা মেয়ের পৃথিবীটাই ছিলো অন্যরকম শক্তিতে ভরপুর। ও যাওয়ারদিন দেড় বছরের মেয়েটা তার বাবাকে যেভাবে আঁকড়ে ধরে কেঁদেছিলো তার অর্থ আজ বুঝি। বাকি দেশ-বিদেশের দেড় বছর বাবা-মেয়ের সম্পর্কটা বুঝানোর ক্ষমতা নেই আমার। বাবা-মেয়ের স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেছে।
আমরা দুজন উচ্চাকাঙ্খী/উচ্চবিলাসী ছিলামনা কখনই। তবু কেনো গেছে আল্লাহ জানেন, ও জানে, আমি জানি, আর জানে কিছু আত্মীয়-স্বজন।
আর বিভ্রান্তিমূলক খবরে আমি হাজারো প্রশ্নের সম্মুখীন। অবশ্য যারা খবর প্রচার করেছেন তাদের কোনো দোষ দেইনা এখন, কেননা ও মানুষের ভালোবাসায় এতটাই সিক্ত যে যেরকম খবর পেয়েছে সেরকমই প্রকাশিত হয়েছে।
আমার স্বামীর সাথে আসলেই কি ঘটেছে ওর সহযাত্রী ৬ জন জানে আর একমাত্র আল্লাহ জানেন। কেননা তাদের কারো কথাগুলো এলোমেলো, কাহিনীটা একই, তবে সবার কথার মাঝে ৫০% মিল আর ৫০% অমিল। এরপরে ওর পাওয়া শরীরের সাথে ওদের কথার কোনো মিল নেই। হয়তো তারাও কল্পনা করেনি রাতের আধাঁরে গহীন জঙ্গলটা কোনো ন্যাশনাল পার্ক (যাওয়ার রাস্তা থেকে ৩০কি:মি অপজিটে) হবে, আর ফেলে যাওয়া শরীরটার অস্তিত্ব কেউ কখনও পাবে।
এখন সবাই বলে আমার পরিচিত/পরিচিতের পরিচিত/তাঁর ও আত্মীয় এভাবে গেছে, মারা গেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। সবাই এখন শুধু মারা যাওয়ার খবর শুনায় অথচ শুধু একটা বডি পাওয়ায় এখনও স্লোভাকিয়ায় নিউজ হচ্ছে।
আমার স্বামীর শরীরটা ৫/৬ দিন পাহাড়ে পরে ছিলো কিন্তু আশ্চর্য রকম সত্য কোনো প্রাণী একটি আঁচড় কাটেনি। তারপরেরটা দীর্ঘ ১ মাসের সংগ্রাম….
ভাই, চাচা, বন্ধু-বান্ধব (সবাই একাধিক) সবার নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় সিক্ত সহযোগিতায় দেশে আসা। যেখান থেকে খোঁজ পাওয়াটাই হয়তো অসম্ভব ছিল, সেই জায়গায় দেশে এনে হাজারো মানুষের ঢলে জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। আমি আল্লাহর কুদরত দেখেছি আরও দেখবো ইনশাআল্লাহ। আর আমি জানিনা কত শুকরিয়া আদায় করবো!
একটা সাধারণ মানুষের জন্য লাখো মানুষের যে ভালোবাসা আর কান্না আমি দেখেছি…। বলার কোনো ভাষা আমার জানা নেই। তবে ও তাঁর সহযোগিতার হাত যখন যেভাবে পেরেছে সেভাবেই করেছে সারাজীবন। কখনও কষ্ট পেয়েও কারো অমঙ্গল কামনা করতে আমি দেখিনি। ৩৩/৩৪ বছরের বাংলাদেশ তো বাদই দিলাম মাত্র যে দেড় বছর ইউক্রেনে ছিলো যাদের সাথে ২/৫/১৫/২০ দিন ও চলাফেরা করেছেন তারাও জানতে চায় ‘ফরিদ ভাইয়ের সাথে কি ঘটেছে ভাবি প্লিজ আমাকে জানাবেন, এত ভালো একজন মানুষ’। বসার ঘরের পাশেই আমার ঘর, প্রায় দেড় মাস বসে বসে হাজারো মানুষের শুধু প্রসংশা শুনি। এখনও মানুষ আমায় দেখতে আসে আমার অঝোরে কান্না আসে, কেননা এত ভালোবাসা নিয়ে মাত্র ৫ বছর আগেও আমায় সবাই দেখতে এসেছিলো তখন আমি ছিলাম রঙ্গিন। ফরিদের মতো এতটা নিঃস্বার্থ মানুষেরা আসলেই ক্ষণজন্মা।
যতদিন বেঁচে ছিলো নিজের মতো করেই বেঁচে ছিলো কিন্তু আমি…. বয়সটা একদম কম না, কিন্তু বাচ্চাদের মতো পিছু পিছু ঘুরতাম। বিদেশ থেকেও যেদিকে বলতো ঐ দিকে যেতাম, সেই আমিও আজ বেঁচে আছি!!! আমার পাশ (দেশ) থেকে নিয়ে গেলে হয়তো……
খুব আড্ডা প্রিয় হয়েও কিছু কারণবসত শেষ দুই বছর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব থেকে নিজেকে অনেকটা আড়াল করে নিয়েছিলো, আমায় বলেছিলো আর কটাদিন দেখো ফরিদ যেরকম সবার মাঝে ছিল ঠিক একই রকম আবার সবার মাঝে ফিরে আসবো, ফিরে আসলো ঠিকই সবার মধ্যমনি হয়ে তবে…..
কোনো বাবা-মা আর যাই করো সন্তানকে মেধা বিকাশের সুযোগ থেকে কোনো স্বপ্নে বিভোর করে বঞ্চিত করোনা। ও খুব মেধাবী ছিলো। অনেক জব করেছে কিন্তু সময়ের সঠিক মূল্যায়ন না করতে পারায় কোনোদিনও তৃপ্ত হতে পারেনি, শুধুমাত্র একটা Designation এর অতৃপ্তি ওকে অনেক কষ্ট দিয়েছে।
আমায় একটা Little Forid (ইরা তাসফিয়া) দিয়ে গেছে ওর জন্য ওকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে হবে।
সব কোলাহল থেমে গেছে, শুধু পিছনে পরে আছি আমি, আমার মেয়ে আর আমাদের স্বপ্ন। আমাদের তিন জনের জন্য দোয়া করো। -মিসেস ফরিদ

প্রসঙ্গত, বিশ্বনাথ উপজেলার কারিকোনা গ্রামের সমশাদ আলীর পুত্র ও ইস্টান ব্যাংক বিশ্বনাথ শাখার সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দিন আহমদ ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপ দেখতে যান রাশিয়া। খেলা শেষ হওয়ার মাস খানেক পর তিনি রাশিয়া থেকে ইউক্রেন যান এবং সেখান থেকে চলতি বছরের ২৮ আগস্ট দালালের মাধ্যমে ৬জন সঙ্গীর সাথে ইউক্রেন থেকে ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এরপর ২ সেপ্টেম্বর ফরিদের সঙ্গীরা ফ্রান্স পৌঁছলেও নিখোঁজ হয়ে যান ফরিদ। গত ৯ সেপ্টেম্বর স্লোভাকিয়ার স্টারিনার পাহাড়ি এলাকার একটি পর্যটন স্পট থেকে ফরিদের মরহেদ উদ্ধার করে সেদেশের পুলিশ। নিউজ পোর্টালের সংবাদের ভিত্তিতে স্লোভাকিয়া গিয়ে ফরিদের লাশ সনাক্ত করেন স্বজনরা। এরপর দীর্ঘ প্রচেষ্টার চালিয়ে একপর্যায়ে গত ৩ অক্টোবর দেশে নিয়ে আসা হয় ফরিদের মরদেহ। পরদিন জানাযার নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে মায়ের পাশেই চির নিদ্রায় শায়িত করা হয় ফরিদ উদ্দিন আহমদকে।


Endofcontent

Endofcontent
You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!