বিশ্বনাথের প্রথম অনলাইন পত্রিকা

মুজিববর্ষ শুরুর আগেই সরকারিকৃত কলেজে নিয়োগ সম্পন্নের দাবি

মো. শরীফ উদ্দিন ::
ঘটনা প্রবাহ-১ : নিলয় একটি সরকারি কলেজের ছাত্র। ২০১৯ সালে এসএসসি পরীক্ষা পাশ করে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করে সে। তার বাবা একজন সবজি বিক্রেতা। ৪ ভাই, ৩ বোনসহ মোট ৯ জনের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তার বাবাকে। বেসরকারি কলেজে বেতন ও ফি বেশি থাকায় নিয়ম অনুযায়ী ৫টি সরকারি কলেজে আবেদন করে। সবগুলো কলেজের নামের সাথে সরকারি লেখা দেখেই আবেদন করে সে। একটি সরকারি কলেজে চান্স পেয়ে ভর্তি হতে যেয়ে দেখে বেতন ও ফি নেয়া হচ্ছে বেসরকারি নিয়মে। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে সে জানতে পারে কলেজটি সদ্য সরকারিকৃত কলেজ। কলেজটি সরকারি হলেও সরকারিভাবে এখনো বেতন ও ফি নির্ধারিত হয়নি। কিন্তু অনলাইনে আবেদন করার সময় এরকম কিছুই লেখা ছিল না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভর্তি হতে না পারলে ভর্তি বাতিল হিসেবে গণ্য হবে বিধায় অনেক কষ্টে ধারদেনা করে সবজি বিক্রেতা বাবা টাকা জোগাড় করে ভর্তি করায় নিলয়কে। এখন প্রতিমাসে যেকোনো সরকারি কলেজ থেকে কমপক্ষে ১০ গুণ বেশি বেতন দিতে হয় তাকে।

ঘটনা প্রবাহ-২ : সালাম সাহেব একটি বেসরকারি কলেজের অনার্সের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন ২০১২ সালে। কলেজ প্রদত্ত সামান্য বেতনে মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় তাঁর। ২০১৫ সালে তিনি বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। ২০১৮ সালের ১২ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনের দ্বারা কলেজটি সরকারি হলে কলেজের অধ্যক্ষ  শিক্ষক-কর্মচারীদের কলেজ প্রদত্ত বেতন ভাতা বন্ধ করে দেন। বর্তমানে স্ত্রী সন্তান নিয়ে তিনি বেতন-ভাতা না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কবে থেকে সালাম সাহেব সরকারি বেতন-ভাতা পাবেন এর কোনো সদুত্তর জানা নেই অধ্যক্ষ মহোদয়ের নিজেরও।

ঘটনা প্রবাহ-৩ : সাবিহা একটি সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু তার কলেজে নিয়মিত ক্লাস হয় না। কারণ কী? সে জানতে পারে কলেজটি সদ্য সরকারি হয়েছে। কলেজের পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের শিক্ষক ২০১৬ সালের শেষদিকে অবসর নিয়েছেন। কলেজে সরকারিভাবে নিয়োগের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় নতুন করে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এসব কারণে সাবিহার এই গুরুত্বপূর্ণ দু’টি বিষয়ে ক্লাস ঠিকমতো হচ্ছেনা।

ঘটনা প্রবাহ-৪ : আশরাফ সাহেব ১৯৮৫ সালে একটি কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। জীবনে অনেক সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করেন তিনি। শুরুতে বেসরকারি এমপিওভুক্ত কলেজে নিয়োগ হলেও ২০১৬ সালে কলেজটি সরকারিকরণের পক্রিয়ায় আসে। তখনই তিনি এলাকাবাসীকে মিষ্টিমুখ করে সুসংবাদটি জানিয়ে দেন। এলাকাবাসীও আনন্দিত হয়। কিছুদিন পর কলেজটি  সরকারি হয়। এ সংবাদে তাঁর পরিবার এবং এলাকাবাসীর আনন্দের মাত্রা যেন আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেল। প্রচার হয় এখন থেকে তিনি সরকারি বেতন-ভাতা পাবেন। কিন্তু দীর্ঘদিন অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় তিনি সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। চলতি মাসেই তিনি অবসরে যাবেন। এখন তিনি জানতে পারলেন নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ার কারণে অবসরে গেলে সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। তাঁর প্রশ্ন, সঠিক সময়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হয়নি কেন? এলাকায় আমার যে সম্মানহানি হলো এর দায়ভার কে নিবে? যাদের চাকরি শেষ হয়নি তারা যদি ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে সরকারি সুযোগ সুবিধা পায় তাহলে আমি তাদের সাথে চাকরি করেও সুযোগ সুবিধা পাবোনা কেন?

উপরের ৪টি ঘটনা প্রবাহ যেকোনো সরকারিকৃত কলেজের যেন এক বাস্তব রূপ! সদ্য সরকারিকৃত যেকোনো কলেজের সাথে এর কোনো না কোনো ঘটনার মিল পাওয়া যাবেই। কোনটিতে একটি, কোনটিতে দুটি  কিংবা কোনটিতে সবগুলোই বিদ্যমান থাকা অস্বাভাবিক নয়!

স্বাধীনতার মহান স্থপতি বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী বছরকে ‘মুজিববর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। জাতির পিতার জন্মদিন আগামী ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত সময়কে মুজিববর্ষ হিসেবে উদযাপন করা হবে। একই সাথে ইউনেস্কোভুক্ত বিশ্বের ১৯৫ টি দেশে পালিত হবে ঐতিহাসিক ও মর্যাদাপূর্ণ এ অনুষ্ঠানটি। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর ৪০ তম অধিবেশনে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ইউনেস্কোর সাধারণ পরিষদের সভাপতি আলতে সেনজাইজারের সভাপতিত্বে এবং মহাপরিচালক মিজ অদ্রে আজুলেসহ বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে ভারত, জাপান, কিউবা, নেপাল ও পোল্যান্ডের লিখিত সমর্থনে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। একজন বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে আমাদের জন্য এটি খুবই গর্বের ও আনন্দের। বছরব্যাপী অনুষ্ঠেয় ‘মুজিববর্ষ’  জাতীয় অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন হবে ২০২০ সালের ১৭মার্চ রাজধানীর জাতীয় প্যারেড স্কোয়ারে।

অন্যান্য সকল শ্রেণি ও পেশার  মানুষদের সাথে শিক্ষকসমাজও অনুষ্ঠানটি আনন্দের সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উদযাপন করতে বদ্ধপরিকর। সদ্য সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষকরা অনুষ্ঠানটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করবে। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষক সমাজের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে যে অনিশ্চয়তা বিরাজমান রয়েছে তাতে মন থেকে কি অনুষ্ঠান উদযাপনের স্বতঃস্ফূর্ততা আসবে? মনের মধ্যে অশান্তির দানা রেখে কোনো কাজ কি সুচারুরূপে পালন করা সম্ভব? সম্ভব হলেও বাস্তবায়ন করা খুবই কঠিন হবে। শিক্ষক নিয়োগ জটিলতার কারণে ছাত্রছাত্রীরাও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। এ অবস্থায় মুজিববর্ষ উদযাপন অনেকটাই ম্লান হতে পারে যা ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানটিতে প্রতিবন্ধক হিসেবে প্রতীয়মাণ হবে। তাই শিক্ষক সমাজের সকল অনিশ্চয়তা দূর করে ছাত্র শিক্ষকের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে ‘মুজিববর্ষ’ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করার স্বার্থে সদ্য সরকারিকৃত কলেজসমূহের দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সরকারি কলেজ স্বাধীনতা শিক্ষক সমিতি, কেন্দ্রীয় কমিটি।


Endofcontent

Endofcontent
You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!