বিশ্বনাথের প্রথম অনলাইন পত্রিকা

‘তক্ষক’ নিয়ে গুজব : বিশ্বনাথ থানার ওসি মুসা’র চ্যালেঞ্জ

এমদাদুর রহমান মিলাদ :: ‘তক্ষক’ বা ‘কক্কা’ মূল্যহীন নিরীহ বন্য প্রাণী হলেও এই প্রাণীকে কোটি টাকা মূল্য বলে দীর্ঘদিন ধরে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে বাণিজ্য ও চোরাচালানীদের সিন্ডিকেট। আর তক্ষক মূল্যহীন প্রাণী তা না জেনে প্রতারকদের ফাঁদে পড়ে তক্ষকের সন্ধানে ঘুরে ঘুরে নিঃস্ব হচ্ছেন অনেকেই। মূল্যহীন নিরীহ বন্য প্রাণী দাবি করে বিশ্বনাথ থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) মো. শামীম মুসা চ্যালেঞ্জ করেছেন, যদি কেউ প্রমাণ করতে পারে তক্ষকের এক টাকাও মূল্য আছে, তাহলে তিনি প্রমাণকারীকে এক লক্ষ টাকা প্রদান করবেন।

বাংলাদেশ থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত কিছু কিছু দ্বীপাঞ্চলে রয়েছে এই প্রাণী। উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায়, তক্ষকের ইংরেজি নাম South Asian Giant House Gecko এবং বৈজ্ঞানিক নাম Gekko gecko। এদের দেহের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩২ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। এরা নিশাচর প্রাণী। টিকটিকি, ছোট ইঁদুর, ছোট পাখি প্রভৃতি তাদের খাদ্যতালিকায় রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ’সহ মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, লাওস, কাম্পুচিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন ও ফিলিপাইন’সহ বিভিন্ন দেশে প্রায় ৬০০ প্রজাতির তক্ষকের বাস।

কথিত আছে, ‘তক্ষক’ এর আকৃতি ১৭ ইঞ্চি হলেই দাম পাওয়া যাবে এক হাজার কোটি টাকা! আর গোপনে তক্ষক সংগ্রহ করে চীন দেশে পাচার করা হয়! চীনে নাকি ক্যানসারের প্রতিষেধক তৈরির কাজে এটি ব্যবহার করা হয়। আবার অনেকেই বলে থাকেন, তক্ষকের মধ্যে মেগনেট রয়েছে। তবে এসবের কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। চরম বিস্ময়কর ও অতি লোভনীয় এই তথ্যটির সত্যতা যাচাই না করেই এক শ্রেণির অর্থলোভী মানুষ বেশ কিছুদিন থেকেই গোপনে নেমে পড়েছেন এই বণ্যপ্রাণী ‘তক্ষক’ সংগ্রহে। আর এতে দেশব্যাপী মরতে হচ্ছে নিরীহ এ প্রাণিকে। কিন্ত হাজার কোটি টাকার লোভে যারা বিভিন্ন স্থানে তক্ষকের সন্ধান করছেন আর অবৈধভাবে প্রাণীটি বিক্রি করছেন তাদের অনেকেই জানেন না যে, তক্ষক মূল্যহীন প্রাণী। তারা এর সন্ধানে ঘুরে ঘুরে নিঃস্ব হচ্ছেন। তবুও তারা হতাশ নন, খুঁজেই চলেছেন। যেখানে সন্ধান পান, সেখানেই ছুটে যান। তাদের মতে, এই প্রণির দুই ধরনের পা রয়েছে। কোনটার ‘মুরগী পা’ আর কোনটার ‘হাঁস পা’। ‘হাঁস পা’গুলোর দাম খুব বেশি। সর্বনিম্ন সাড়ে ৯ ইঞ্চি লম্বা ও ৫২ গ্রাম ওজনের ‘হাঁস পা’ চলে। এর কম ওজন বা লম্বায় সাড়ে ৯ ইঞ্চির ছোট হলে চলবে না। ইঞ্চির মাপ ধরা হয় চোখ থেকে লেজের শেষ পর্যন্ত। ‘মুরগি পা’গুলো ২৫৫ গ্রাম ওজন ও সাড়ে ১৫ ইঞ্চি লম্বা হতে হবে। এ ছাড়া একটা আছে ‘বার্মিজ’। ‘বার্মিজটা’র ওজন সাড়ে তিনশ গ্রামের নিচে হলে বিক্রির অনুপযুক্ত। গহীন বনের এই নিরীহ প্রাণীটির কয়েক কোটি টাকা দাম এই অপপ্রচার চালিয়ে সম্প্রতি দেশের এলাকায় রয়েছে বাণিজ্য ও চোরাচালানীদের একটি শক্ত সিন্ডিকেট। মূলত অপপ্রচারের মাধ্যমে মানুষকে এই ব্যবসায় জড়িত করে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়াই এই চক্রটির উদ্দেশ্য। এভাবে তক্ষক নামক এই বন্যপ্রাণীটিকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। কোথাও এমন কোন তথ্য মিলেনি যেখানে একটি তক্ষকের দাম এত বেশি হতে পারে। তক্ষকের ছোট শরীরের চামড়া, মাংস বা অন্যকোন বস্তু এমন কোন কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না যেখানে এত অধিক পরিমাণ অর্থের যোগসূত্র থাকতে পারে। প্রাণি বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের অভিমত এখনই তক্ষকের এমন উচ্চ মূল্যের প্রচারণা থেকে সকলের বেরিয়ে আসা উচিৎ নতুবা একসময়ে এই প্রাণীটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

তক্ষক মূল্যহীন নিরীহ প্রাণী দাবি করে বিশ্বনাথ থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) মো. শামীম মুসা বলেন, একটি তক্ষকের কোটি টাকা মূল্য দাবি করা নিতান্তই অযৌক্তিক ও গুজব। দেশের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্য ও চোরাচালানীদের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মূলত অপপ্রচারের মাধ্যমে মানুষকে এই ব্যবসায় জড়িত করে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়াই ওই চক্রের উদ্দেশ্য। তিনি চ্যালেঞ্জ করে বলেন, ‘যদি কেউ প্রমাণ করতে পারে তক্ষকের এক টাকা মূল্যও আছে, তাহলে আমি তাকে এক লক্ষ টাকা দেব।’

ওসি বলেন, সূর্যের আলো যেমন অমূল্য, তা কখনো বিক্রি করা যায় না। তেমনি তক্ষকও বিক্রয় করা যায় না। প্রতারক চক্র ‘তক্ষকের মূল্য কয়েক কোটি টাকা’ বলে অপপ্রচার চালিয়ে নিরীহ এই প্রজাতির প্রাণিটিকে ধ্বংস করছে। ওই চক্রের প্রতারণায় এক শ্রেণির অর্থলোভী মানুষ না বুঝেই গোপনে নেমে পড়েন এই ‘তক্ষক’ সংগ্রহে। প্রতারক চক্র ‘তক্ষক’ এক হাত থেকে অন্য হাতে কেনা-বেচা করে এবং সর্বশেষে ওই প্রাণীটি মারা যায়, না হয় প্রতারক চক্রটি বিক্রয়কারীকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ধরিয়ে দেয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী উদ্ধার হওয়া তক্ষকটি বন বিভাগের কাছে হস্তান্তরের পর সেগুলিকে গভীর বনাঞ্চলে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। পৃথিবীর কোথাও আজ পর্যন্ত তক্ষক কোটি বা লাখ টাকায়ও বিক্রি হয় নি। কেউ আজ পর্যন্ত কোথাও একটি তক্ষক বাজারে বিক্রি করেছেন এধরনের কোন তথ্য-প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবেন না। এসব প্রাণী কেনা-বেচার কোন হাট নেই। সরকারি বা বেসরকারিভাবে আজ পর্যন্ত তক্ষকের কোন মূল্যও নির্ধারণ করা হয়নি।


Endofcontent

Endofcontent
You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!