বিশ্বনাথের প্রথম অনলাইন পত্রিকা

দেশসেরা চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ হয়েও সংগীতের প্রতি রয়েছে যার অনুরাগ…

আব্বাস হোসেন ইমরান ::  ডা. মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। স্বনামে-সুনামে দেশজুড়ে পরিচিত এক নাম। দেশসেরা চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ। সিলেট বিভাগের মধ্যে একমাত্র রেটিনা বিশেষজ্ঞ। ১৯৯৩ সালে এমবিবিএস উত্তীর্ণ ডা. জহির চোখের চিকিৎসা বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন ২০০৫ সালে। পরে যোগ দেন ঢাকা জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটে। ১৯৯৪ সালে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডাঃ নূরুল আম্বিয়া চৌধুরীর কন্যা ডাঃ শরীফুন্নেছা চৌধুরীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ডা. মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই পুত্র সন্তানের জনক। তার তিন ভাইয়ের মধ্যে এক ভাই যুক্তরাজ্যের একটি হাসপাতালের চিকিৎসক। অপর দুইজন ব্যাংকার। তার দুই বোনের মধ্যে একজন শিক্ষিকা ও একজন ব্যাংকার। ছাত্রজীবনে অদম্য মেধাবী এই চিকিৎসক নিজের পেশাজীবনেও রেখে চলেছেন একের পর এক মেধার স্বাক্ষর। সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার বেতসান্দি গ্রামের ময়না মিয়া-ছালেহা বেগম দম্পতির জ্যেষ্ঠপুত্র ডা. জহিরের চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি আরেকটি বড় পরিচয় রয়েছে। তিনি আপাদমস্তক গানের মানুষ। তিনি দেশসেরা চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ হয়ে শত ব্যস্ততার মধ্যেও সংগীতের প্রতি রয়েছে তার অনুরাগ।
একজন গীতিকার-শিল্পী হিসেবে সম্প্রতি উঠে এসেছেন আলোচনায়। সঙ্গীতাঙ্গনে পরিচিত হয়ে উঠেছেন ‘জহির অচিনপুরী’ নামে। নিজেই গান লিখেন। নিজেই সুর করেন। আবার নিজেই কণ্ঠ দেন নিজের গানে। সর্বশেষ, সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় নিজের রচিত ‘ধুন্ধুর মুন্ধুর’ গান গেয়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছেন সঙ্গীতানুরাগী মহলে। চিকিৎসা পেশা ও গানের নেশা একসাথে করে পথচলার বিষয়টি তিনি গানের মাধ্যমেই ব্যক্ত করেছেন এভাবে-
‘বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আমি, করি চোখের ডাক্তারী
গান আমার প্রাণের খোরাক, রচি সঙ্গীত অচিনপুরী।’
পবিত্র ঈদুল ফিতর-২০১৯ উপলক্ষে বিশ্বনাথের প্রথম অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘বিশ্বনাথ নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম’ কর্তৃক প্রকাশিত বিশেষ ম্যাগাজিন ‘উৎসব’ -এর জন্য একটি সাক্ষাৎকার নিতে সম্প্রতি একরাতে সিলেটে ডা. মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের চেম্বারে তার সাথে কথা হয় বিশ্বনাথের গণমাধ্যমকর্মী আব্বাস হোসেন ইমরানের। কথার বড় অংশজুড়েই ছিল তার গান লেখা ও গান গেয়ে চলার প্রসঙ্গ। উৎসব-এ প্রকাশিত সাক্ষৎকারটি নিউজ পোর্টালের পাঠকদের জন্যে তুলে ধরা হল।

আব্বাস হোসেন ইমরান : পেশাগত দায়িত্ব ও ব্যস্ততার মধ্যেও গানে কিভাবে আসা?
জহির অচিনপুরী : আমার গানের ভাবনা ছোটবেলা থেকেই। তখন থেকেই আমি গানের মানুষ। এটা অভ্যাসগত একটা বিষয়। আমি টের পেতাম আমার ভেতরে গান বুদবুদ করে। কথায় কথায় গানের কলি মুখে চলে আসত। পেশাগত দায়িত্ব ও ব্যস্ততার যে ব্যাপার, আমি মনে করি এর জন্যে বিশেষ সময়ের জন্যে প্রয়োজন হয় না। এগুলো ভেতরগত বিষয়। আর অভ্যাসগত হওয়ায় এটার জন্যে বেশি পরিশ্রমও লাগে না।
আব্বাস হোসেন ইমরান : একটু বুঝিয়ে বলবেন কি?
জহির অচিনপুরী : মনে করুন, আমি বাসা থেকে হাসপাতালে যাচ্ছি। পথে যানজট থাকায় গাড়ির ভেতরে বসে আছি। এই অবস্থায় গাড়িতে বসেই আমার একটা গান লেখা হয়ে গেল। হাসপাতালে যাওয়ার পর তো আমি নিয়মিত রোগী দেখি। রোগী দেখা শেষ হলে যে সময় থাকে, সেটাতো ব্লাঙ্ক টাইম। তাই প্রতিদিন রাত ১০টা থেকে ১২টা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত গান লিখি। গান করি বা গানের চর্চা করি। ঢাকা ও সিলেটে আমার নিজস্ব স্টুডিও (অচিনপুরী স্টুডিও) আছে। মূলতঃ সেখানেই চর্চাটুকু চলে। আমার কিছু যন্ত্রশিল্পী আছেন, ডেকে পাঠালেই তারা চলে আসেন।
আব্বাস হোসেন ইমরান : পরিবারের আর কেউ কি গানের মানুষ?
জহির অচিনপুরী : পরিবারের সকলেই গান-বাজনা অপছন্দ করেন। এমনকি আমার সহধর্মীনিও। তবে একমাত্র ব্যতিক্রম আমার বাবা। কারণ, তিনি নিজেই গানের মানুষ। তিনি মুর্শিদভক্ত। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, বাবা নিজেই গান লিখেন। নিজেই গান করেন। তার নিজের লিখা ১২৫টির মত গান আছে। এর মধ্যে অনেক গান আমি গেয়েছি। অনেকটা ছন্নছাড়া হওয়ায় সংসারের স্বচ্ছলতার প্রয়োজনে একবার আমার নানা বাবাকে বাহরাইন পাঠিয়ে দেন। সেখানে গিয়ে তিনি রুজিরোজগার আশানুরুপ না করতে পারলেও নিজের গানের অনেক ভক্ত-অনুরাগী তৈরী করে ফেলেন। তখন আমার মা-ই খুব কষ্ট করে সংসার আগলে ধরেন।
আব্বাস হোসেন ইমরান : চিকিৎসা এবং গান-দুটোকেই কি অভিন্ন মনে করেন?
জহির অচিনপুরী : অবশ্যই। আমার গানগুলো মানুষকে নিয়ে, মানুষের ভালবাসা নিয়ে, গানও তাই। গানের ভেতরে যে বক্তব্য, চিকিৎসাতেও তাই। চিকিৎসার মাধ্যমে মানুষের উপকার করি। গানের প্রতি আমার যে অনুরাগ, গানের যে চেতনা, সেটা আমার চিকিৎসা সেবায় প্রভাব ফেলে বিধায় আন্তরিকতার সাথেই মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিতে পারি।
আব্বাস হোসেন ইমরান : আপনার গানের কোনো অ্যালবাম কি বের হয়েছে?
জহির অচিনপুরী : ২১০৩ সালে আমার নিজের লেখা গান নিয়ে ‘ক্ষণিকের অতিথি’ নামে একটি অডিও অ্যালবাম বের হয়েছিল। সবগুলো গানই ছিল আধ্যাত্মিক ধাঁচের।
আব্বাস হোসেন ইমরান : নিজে গান গাইতে শুরু করলেন কবে থেকে?
জহির অচিনপুরী : একটা সময়ে এসে মনে হল, আমার গানগুলো কোনো প্রখ্যাত শিল্পী বা কেউ-ই করবে না। কারণ, আমার তো মার্কেট প্লেস নেই। অনেককে বলেছিলাম, আমার গান করার জন্যে। তারা গেয়েছে ঠিক, তবে এতই অমর্যাদা করে গেয়েছে যে, সে গানের ভেতরে আমার বক্তব্যটুকুই ঠিক থাকেনি। আমি ভেবে দেখলাম, আল্লাহ তায়ালা আমাকেও তো কণ্ঠ দান করেছেন। আমি কেন গাইবো না! গান গাইতে শুরু করলাম। দেখি, আমার কণ্ঠেরও একটা ভেল্যু আছে।
আব্বাস হোসেন ইমরান : কার লেখা গান করতে বেশি পছন্দ করেন? শুধুই নিজের না অন্য কারোরও?
জহির অচিনপুরী : আমি নিজেই লিখি। নিজেই সুরারোপ করে গেয়ে থাকি। অন্য কারো গান করি না এ কারণে, প্রত্যেকের গানের একটা গ্রামার আছে। গানের একটা ধাঁচ আছে। কণ্ঠের সাধনা ব্যতিত সেসব গান করা যায়। আমি কণ্ঠের সাধনা করি না হেতু অন্যের গান করার চেষ্টা করি না। আমার নিজের ভেতরে কিছু বক্তব্য তৈরী হয় বলে সেগুলো গান আকারে লিখে নিজেই গেয়ে মনের খোরাক মিটাই।
আব্বাস হোসেন ইমরান : কোন শিল্পীর গান পছন্দ করেন?
জহির অচিনপুরী : এক সময় ক্বারী আমির উদ্দিনের গান শোনতাম। ছাত্রবস্থায় আমার একটা টেপ রেকর্ডার ছিল। কলেজের যাওয়ার পথে গাড়ীতে বা হোস্টেলে কানের কাছে রেখে অল্প শব্দে ক্বারী আমির উদ্দিনের গান শোনতাম। বেতারেরও শ্রোতা ছিলাম আমি। বাদ্যযন্ত্র দোতারার খুবই ভক্ত আমি। বেতারের একজন দোতারা বাদককে প্রতি বৃহষ্পতিবার মেডিকেল হোস্টেলে আমার রুমে নিয়ে আসতাম। সে বাজাতো, আমি শোনতাম।
আব্বাস হোসেন ইমরান : আপনি তো কাছিদা বাংলা অনুবাদ করে গেয়েছেন?
জহির অচিনপুরী : আমি ৪টি কাছিদা বাংলা অনুবাদ করেছি। বিশেষ করে কাছিদায়ে বুরদা। কাছিদায়ে বুরদা এর আগে গদ্য আকারে অনুবাদ হয়েছে। আমি প্রথম কাছিদায়ে বুরদার অর্থকে সঙ্গীতাকারে নিয়ে এসে গেয়েছি। উদ্দেশ্য হল, ইমাম বুসাইরীর কাছিদায়ে বুরদার কথাগুলোর মাঝে যে নুর আছে, তা মানুষকে বুঝানো।
আব্বাস হোসেন ইমরান : আপনার নিজের লেখা গানের সংখ্যা কত? গানের পান্ডুলিপি আছে?
জহির অচিনপুরী : নিজের লেখা গান ২শ’র অধিক হবে। অগোছালো মানুষতো, সে কারণে পান্ডুলিপি করা হয়নি এখনও।
আব্বাস হোসেন ইমরান : ভক্তরা কি বেতার টেলিভিশনে আপনার গান শোনতে পাবে?
জহির অচিনপুরী : দেখা যাক। সময়ই বলে দিবে। তাছাড়া, সম্প্রতি তো বাংলাদেশ বেতারে শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছি।
আব্বাস হোসেন ইমরান : আপনার ‘ধুন্দুর মুন্দুর’ গান তো সাড়া ফেলে দিয়েছে সর্বত্র!
জহির অচিনপুরী : এই গানটি আসলে পূর্বপরিকল্পনা নিয়ে রচনা করিনি। হঠাৎ করে মাথায় চলে আসল। সাথে সাথেই যন্ত্রশিল্পীদের ডেকে এনে গেয়ে দেখি ভালই তো হয়েছে। সমাজের নানা অসঙ্গতি উঠে এসেছে। তাৎক্ষণিক গানটি রেকর্ড করে ফেলি।
আব্বাস হোসেন ইমরান : গানের তো ভক্ত-মিত্র আছে। শত্রু আছে?
জহির অচিনপুরী : না। আমি নিজেই নিজের শত্রু। নিজেই নিজের মিত্র। সামগ্রিকভাবে আমার কোনো শত্রু নেই।
আব্বাস হোসেন ইমরান : জীবন নিয়ে কতটুকু সন্তুষ্ঠ ?
জহির অচিনপুরী : শতভাগ সন্তুষ্ঠ। ভালই তো আছি। সবাইকে নিয়েই তো আছি। বাবা-মা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে একসাথেই বসবাস করছি।
আব্বাস হোসেন ইমরান : চিকিৎসা ও গান-এই দুটো একসাথে করে পথচলা জহির অচিনপুরীর জীবনের লক্ষ্য কি ?
জহির অচিনপুরী : এবার হজ্জ করে এসে একটি বৃহৎ চক্ষু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু করব। এটাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। ইচ্ছে আছে সিলেটের হুমায়ূন রশীদ চত্তর থেকে তেলিবাজার পর্যন্ত এই জায়গাটুকুর ভেতরে কোথাও হাসপাতালটি স্থাপন করার।
আব্বাস হোসেন ইমরান : সাক্ষাৎকারের প্রদানের জন্যে আপনাকে উৎসবের পক্ষ থেকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আগাম ঈদ মোবারক।
জহির অচিনপুরী : আপনিসহ উৎসব পরিবারের সবাইকেও ধন্যবাদ। ঈদ মোবারক।


Endofcontent
You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!