বিশ্বনাথের প্রথম অনলাইন পত্রিকা

পতাকা হচ্ছে রাষ্ট্র বা জাতীর মুক্তি এবং সার্বভৌমত্বের প্রতীক

এ এইচ এম ফিরোজ আলী :: পতাকা হচ্ছে রাষ্ট্র বা জাতীর মুক্তি এবং সার্বভৌমত্বের প্রতীক। স্বাধীনতার প্রতীক-এ পতাকা অর্জনের জন্যই যুগে যুগে আন্দোলন-সংগ্রাম, সশস্ত্র যুদ্ধ, আত্মদান করেছে অনেক জাতি। পতাকা মুক্তি ও স্বাধীনতার সর্বোচ্চ অহংকার হচ্ছে, একাত্তুরের ২মার্চ। স্বাধীনতা সংগ্রামের যে, কতগুলো ঐতিহাসিক দিন রয়েছে, তার মধ্যে ২মার্চ হচ্ছে একটি ঐতিহাসিক স্মরণীয় ও বরণীয় দিবস। এ উপমহাদেশের ৩টি রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ‘লাল সবুজের, ভারতীয় পতাকা ‘তিরঙ্গা, আর পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা ‘চাঁদ তাঁরা,। ভারতীয় দীর্ঘমুক্তি সংগ্রামের বাঁকে বাঁকে অনেকবার পতাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু ১৯২১ সালে মাহাত্মাগান্ধির প্রস্তাবে ভারতীয় পতাকার নকশা অনুমোদন করা হয়। ১৯২৯ সালের ৩১ডিসেম্বর রাতে লাহোরের রাভি নদীর তীরে জওহরলাল নেহেরু ব্রিটিশ উপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে অভিবক্ত ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে প্রথম, সত্য ও অহিংস পন্থায় ‘স্বরাজ, পতাকা উত্তোলন করেন। স্বরাজ পতাকা উত্তোলনের ১৭বছর পর ১৯৪৭ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে আদেশানুসারে (ADOPTION ORDER) ভারতের স্বাধীনতা গ্রহণ করা হয়। ১৯৭১ সালের ১১আগষ্ট পাকিস্তানের চাঁদ তারার গ্রহন করা হয়, CONSTITUENT ASSEMBLY তে। পাকিস্তান পতাকার ডিজাইনার হচ্ছেন, সৈয়দ আমির উদ্দিন কিদওয়াই। ১৯০৬ সালের পাকিস্থান মুসলিম লীগের পতাকাকে ভিত্তি করে তৈরি করা হয় পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা। আর বাংলাদেশের পতাকার পরিকল্পনা করা হয়, সিরাজুল আলম খানের নির্দেশনা ও অনুমোদনে। ১৯৭০ সালের ৬জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের (ইকবাল হল) ১১৮ নম্বর কক্ষে ছাত্রলীগ নেতা আ.স.ম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ, কাজি আরেফ আহমদ, মার্শাল মনিরুল ইসলাম, হাসানুল হক ইনু ও শিবনারায়ন দাস পতাকার নকশা করার পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন। সভায় কাজী আরিফের প্রাথমিক প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে আলোচলা শেষে গাঢ় সবুজ জমিনের ওপর লাল সুর্যের মাঝে হলুদ রঙের বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা তৈরীর সিদ্ধান্ত হয়। তাঁর পর ঢাকা প্রকোৗশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরেবাংলা হলের ১১৬ নম্বর কক্ষে রাত ১১টার পর বাংলাদেশের পতাকার পরিকল্পনা মোতাবেক লাল সূর্যের বৃত্তের ওপর পুর্ব বাংলার মানচিত্র আঁকেন ইতিহাসের শ্রেষ্ট চিত্রকর্ম শিবনারায়ন দাস। পুরো পতাকার ডিজাইন সম্পন্ন করার পর সেই রাতেই ঢাকার নিউ মার্কেট এলাকার বলাকা ভবনের তিন তলায় ছাত্রলীগের কার্যালয়ের পাশে ‘নিউ পাক ফ্যাশন টেইলার্সের দর্জি খালেক মোহাম্মাদী, পতাকার নকশা বুঝে নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং তাঁরা ভোরের মধ্যেই কয়েকটি পতাকা তৈরি করে ছিলেন। কাজী আফির আহমদের মতে স্বাধীন বাংলার পতাকা তৈরীর ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু সরাসরি জড়িত ছিলেন। (ড. মোহাম্মদ হান্নান-বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধের ইতিহাস স্টুডেন্ট ওয়েজ ১৯৯২ পৃষ্টা ২৬৯)।
শিবনারায়ন দাস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পাকিস্থানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ছবি পা দিয়ে অবমাননার দায়ে মাথায় হুলিয়া নিয়ে দীর্ঘ দিন পালিয়ে ছিলেন। একাত্তুরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কুমিল্লায় হানা দিয়ে তাঁকে না পেয়ে তাঁর পিতা আর্য়ুবেদীক চিকিৎসক সতীশ চন্দ্র দাসকে নৃশংস ভাবে হত্যা করে। শুধু তাই নয় মাইকিং করে শিবনারায়ন দাসের মাথার দাম ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষনা করে পাকবাহিনী। ৬৯ এর শিক্ষা আন্দোলনে জেল খেটেছেন শিবনারায়ন এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ১৭ নম্বর আসামি ছিলেন তিনি। শিবনারায়ন ভাষা সৈনিক দীরেন্দ্র দত্তের হাত ধরে রাজনীতিতে এসে ছিলেন।
একাত্তুরের ১মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১টা ৫মিনিটে এক বেতার ভাষনে পূর্ব নির্ধারিত ৩মার্চের ঢাকায় আহুত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনিদিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষনার পর মুহুর্তেই পুর্ব বাংলার পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ভিমরুলের মত পূর্ববাংলার মানুষ উত্তেজিত হয়ে পড়েন। ইয়াহিয়া খান যেন বাঙালির কাটা গায়ে লবন ছিটিয়ে দিয়েছিলেন। এ দিন সর্বত্র বিক্ষোভ আর উত্তেজনায় মিছিলের নগরিতে পরিণত হয় ঢাকা। স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তেলন করা হয় একাত্তুর সালের ২মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায়। এ অবস্থায় ১মার্চ নিউ ক্লিয়ার্সের নির্দেশে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে পর দিন (২মার্চ) দুপুর ১১টায় ছাত্রলীগ ও ডাকসুর আহবানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বট তলায় লাখ লাখ ছাত্র জনতার সামনে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হয়। এসময় মূহ মূহ করতালি ও শ্লোগানে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা, বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীনকর, তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব। এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন নুরে আলম সিদ্দিকি। তৎকালীন ডাকসুর ভিপি আসম আব্দুর রব স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে বাঙালির স্বাধীন আবাস ভুমি অর্থাৎ বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় অনিবার্য করে তোলেন। ২মার্চ পতাকা উত্তোলন ছিল উপনিবেশিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের আনুষ্টানিক মৃত্যু পরোয়ানা। পতাকা উত্তোলনের সময় পাশে ছিলেন শাহজাহান সিরাজ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন সহ ছাত্রলীগের তৎকালীন অন্যতম তুখুড় ছাত্রনেতারা। পতাকা উত্তোলনকারী আ.স.ম আব্দুর রব বলেছিলেন, আজ থেকে এটাই স্বাধীন বাংলার পতাকা। লাখো লাখো ছাত্র জনতা মনে প্রাণে সেদিন স্বাধীনতার এই পতাকাকে গ্রহণ করেছিলেন।

এদিন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ঢাকায় এবং ৩মার্চ পূর্ব বাংলায় হরতাল পালিত হয়। ২ ও ৩ মার্চ হরতাল দমনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করে। ৪মার্চ সকালে নিহতদের লাশ সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়া সরকারকে উৎখাতের আহবান জানান।
৩মার্চ পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে ইশতেহার ঘোষনা করা হয় এবং তা পাঠ করেন শাহজাহান সিরাজ। ইশতিহারে বলা হয়, ৫৫ হাজার ৫০৬ বর্গমাইল বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকার ৭কোটি মানুষের আবাসিক ভুমি হিসেবে স্বাধীন ও সার্বভৌম এ রাষ্ট্রের নাম বাংলাদেশ। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি, সংগীতটি গৃহীত হয়। উপনিবেশিকবাদি পাকিস্তান পতাকা পুড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকার ব্যবহার ও উত্তোলনের নির্দেশ দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক ঘোষনা করা হয়। জয় বাংলাকে বাংলাদেশের জাতীয় শ্লোগান হিসেবে নির্ধারিত হয়। ১৫মার্চ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসলে বঙ্গবন্ধু গাড়িতে কালো পতাকা লাগিয়ে বৈঠকে যোগদান করেন। ইয়াহিয়া বুঝতে পারলেন, শেখ মুজিব কি চাচ্ছেন? তারপর অপারেশন বিøটজ পরিবর্তন করে অপারেশন সার্চ লাইট এর নীল নকশা প্রবর্তন করে ২৬মার্চ রাতে নিরীহ বাঙালি হত্যা শুরু করেন। ২৩মার্চ জয়বাংলা বাহিনী সামরিক কুচকাওয়াজের মাধ্যমে পতাকা উত্তোলন করে স্বাধীন বাংলার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা আ.স.ম আব্দুর রব সকলকে নিয়ে ধানমন্ডির ৩২নম্বর বাড়িতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর হাতে পতাকা তোলে দেন এবং বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ও গাড়িতে সেই পতাকা লাগিয়ে দেয়া হয়। যে কারনে মার্চ মাসকে স্বাধীনতার যৌবনের মাস, উত্তাল মার্চ, অগ্নিঝরা মার্চ নামে খ্যাতি অর্জন করেছে। একাত্তুরের ১৭এপ্রিল মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে জাতির শ্রেষ্ট গর্ব লাল সবুজের পতাকা উত্তোলিত করে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এই পতাকা দিয়ে একাত্তুরের যুদ্ধের মাঠে ময়দানে শহীদদের পবিত্র দেহ জড়িয়ে চিরকালের জন্য, চিরদিনের মতো চিরনিদ্রায় শায়িত করা হতো। আজও মুক্তিযোদ্ধারা মৃত্যুর পর পতাকা মুড়িয়ে গার্ড ও অনার দিয়ে জাতির বীর সন্তানদের সম্মান জানানো হয়।
এই পতাকা হাতে নিয়ে বাঙালী জাতি ৭মার্চ, ২৬মার্চ, ১৭এপ্রিল, ১৬ডিসেম্বর সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিবসে দেশ ব্যাপী বিজয় উৎসব পালণ করেন। কিন্তু ২মার্চ সময়ের ব্যবধানে পতাকা দিবসের কথা আমরা যেন একেবারে ভূলে যাচ্ছি। মনে রাখতে হবে বাঙালী জাতি তার স্বপ্নের পতাকা উড়তে দেখেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের রক্তাক্ত জমিনের ওপর। তাই ২মার্চ আমাদের জাতীয় জীবনে একটি ঐতিহাসিক দিন। এ দিবসে পতাকা উত্তোলণের কথা যুগে যুগে নতুন প্রজন্মকে জানিয়ে দিতে হবে।
বাঙালির প্রতিটি রক্তের ফুটার কথা ইতিহাসে সংরক্ষন ও স্মরণ রাখতে হবে। নতুবা আমরা কোন এক সময় অকৃতজ্ঞ জাতী হয়ে যাবো। ২মার্চ বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি করে পতাকা উড়–ক, মিছিলে মিছিলে একাত্তুরের চেতনায় জেগে উঠুক এই বাংলার জমিন-এটাই আমাদের পতাকা দিবসের অঙ্গীকার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতীক, লাল সবুজের পতাকার প্রতি আমরা যেন গভীর শ্রদ্ধাশীল হই।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

AFTER NEWS
You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.