বিশ্বনাথের প্রথম অনলাইন পত্রিকা

লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত আরাফাত ময়দান

বিশ্বনাথনিউজ২৪ :: ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা, ওয়াননিমাতা লাকা ওয়ালমুলক, লা শারিকা লাকা’ ধ্বনিতে সোমবার মুখরিত ছিল আরাফাত ময়দান। ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে হাজীদের উপস্থিত হওয়া হজের অন্যতম ফরজ। এ জন্য সারা বিশ্বের প্রায় ২০ লাখ মুসলমান গতকাল জড়ো হন এ ময়দানে। সেখানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করেন হাজীরা। ক্ষমা ও মুক্তির জন্য হাজীরা আরাফার ময়দানে মহান আল্লাহর কাছে রোনাজারি করেন। কেউ পাহাড়ের কাছে, কেউ গাছের নিচে, যার যার সুবিধাজনক জায়গায় বসে ইবাদত করেন। আল্লাহর কাছে জীবনের গোনাহ মাফের জন্য একান্ত আর্জি জানান। এ আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়েই সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হজরত মুহাম্মদ সা: প্রায় চৌদ্দ শ’ বছর আগে বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। লাখো মানুষের উদ্দেশে প্রদত্ত ওই ভাষণের পর আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষণা এসেছিল দ্বীনের পরিপূর্ণতার। আজো সেই ধারাবাহিকতায় খুতবা-ভাষণ দেয়া হয়।
আরাফার ময়দানসংলগ্ন মসজিদে নামিরা থেকে হজের খুতবা দেন মসজিদে নববীর সিনিয়র ইমাম ও খতিব মদিনা কোর্টের বিচারপতি শায়খ ড. হুসাইন আশ শায়খ। গতকাল স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ১৮ মিনিটে তিনি খুতবা দেয়া শুরু করেন। ৩১ মিনিটব্যাপী খুতবা শেষ হয় ১২টা ৪৯ মিনিটে। খুতবা সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও বিশ্বের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার করে। মসজিদে নামিরায় উপস্থিত থেকে খতিবের খুতবা শোনেন সৌদি আরবের গ্রান্ড মুফতি, মক্কার গভর্নর, রাজপরিবারের সদস্য ও বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা।
খুতবায় তিনি আল্লাহর ইবাদতের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ পালন ও সৎ কাজের আদেশের বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি নবী-রাসূলদের জীবনের উদাহরণ টেনে বলেন, কোনো অবস্থায়ই অন্যায়ের কাছে মাথানত করা যাবে না। আল্লাহর একত্ববাদের বিষয়টি মানতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। খুতবায় জ্ঞানার্জনের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন খতিব। তিনি বলেন, জ্ঞান মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যায়। জ্ঞান সুসংবাদ বহন করে। মানুষকে আল্লাহ তায়ালা তার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এটি বুঝতে হলে জ্ঞানার্জন করতে হবে। তিনি নামাজ কায়েমের কথা বলেন। এ সময় তিনি জাকাত পরিপূর্ণভাবে আদায়ের জন্যও তাগাদা দেন। এসব ইবাদত মানুষকে আল্লাহর প্রিয়পাত্রে পরিণত করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রমজান মাসে রোজা রাখা ও হজ পালন অনেক ফজিলতপূর্ণ আমল। খতিব ড. হুসাইন আশ শায়খ হজের গুরুত্ব ও ফজিলত নিয়ে কুরআন-হাদিসের বহু উদ্ধৃতি পাঠ করেন। খুতবায় তিনি মানুষের চরিত্র গঠনের প্রতি গুরুত্ব দেয়ার জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় বিষয়গুলো সন্নিবেশ করার কথা বলেন। তিনি বলেন, নবী করিম সা: ছিলেন উত্তম চরিত্রের অধিকারী। আমরা তার উম্মত। কিন্তু চরিত্রের দিক থেকে আমাদের অবস্থান অনেক অনেক নিচে। এটি লজ্জার। চরিত্র সব কিছুর মূল উল্লেখ করে তিনি বলেন, চরিত্রের সাথে অনেক কিছু জড়িত। ওয়াদা রক্ষা, মিথ্যা পরিহার, বয়োজ্যেষ্ঠদের সাথে শ্রদ্ধাপূর্ণ ব্যবহার, ছোটদের স্নেহ, মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন ও স্ত্রীর অধিকারের মতো বিষয়গুলো চরিত্রবানরাই পালন করেন।
খুতবার পর মসজিদে নামিরায় একসাথে জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করেন হাজীরা। আরাফাতের ময়দানে সারাদিন অবস্থানের পর হাজীরা প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে মুজদালিফায় গিয়ে রাত যাপন করেন। আজ ১০ জিলহজ ফজরের নামাজ আদায় করে মুজদালিফা থেকে আবার মিনায় ফিরবেন তারা। এখানে বড় শয়তানকে পাথর মেরে, কোরবানি করে মাথা মুণ্ডন করবেন। পরে কাবা শরিফ তাওয়াফ করবেন তারা। এ তাওয়াফকে বলা হয় তাওয়াফে জিয়ারত, যা হজের তিনটি রুকনের একটি। পরে তারা মিনায় ফিরে ১১ ও ১২ জিলহজ সেখানে অবস্থান করবেন। সেখানে প্রতিদিন তিন শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন মুসলমানেরা।
এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২০ লাখ মুসলমান মক্কায় হজ করতে গেছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে হজ করতে গেছেন এক লাখ ২৭ হাজার ২৯৭ জন।
হজ উপলক্ষে এবার মক্কায় কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মিনায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের সময় যেন কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য ভাগ ভাগ করে মুসলমানদের সেখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে সৌদি হজ কর্তৃপক্ষ। মক্কায় দ্রুত ভিড় অপসারণ এবং যেকোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে বিপুল পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। হজ পালন করতে যাওয়া ব্যক্তিদের পথচলা ও দিকনির্দেশনার জন্য বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত রয়েছে। হজের অনুমতি না থাকা কোনো ব্যক্তি যেন মক্কায় প্রবেশ করতে না পারে, এ জন্য বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অবৈধ ব্যক্তিদের আটক করতে বাহিতা ও হাদা এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধার অভিযানের জন্য বিপুলসংখ্যক কর্মী মোতায়েন করেছে বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ। হজের পাঁচ দিন মক্কা ও পবিত্র স্থানগুলো পরিষ্কারের জন্য প্রায় ২৬ হাজার কর্মীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।


Endofcontent

Endofcontent
You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!