বিশ্বনাথের প্রথম অনলাইন পত্রিকা

ডাক্তার যখন কসাই

মো. ফজল খান :: আমাদের দৈনন্দিন জীবনে রোগ বালাই থাকবেই। কারো কম, কারো বেশী। রোগের চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের কাছে যেতে হয়। রোগ বেশী হলে সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। রোগমুক্তির জন্য চিকিৎসা নিয়ে থাকি। আমাদের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য সামান্য সর্দি, কাশি, পেট ব্যাথা, জ্বর, মাথা ব্যথা হলে ডাক্তারের কাছে ছোটে যাই। ডাক্তার সামান্য ঔষধ লিখে দিলেই রোগ সেরে যাবে। হাসপাতাল গুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিলে রোগ মুক্তি হয়ে যাবে।
অনেক গুণী ও ভালো ডাক্তার আছেন যাদের দ্বারা আমাদের সঠিক চিকিৎসা করাতে পারছি। তাঁদের কাছে টাকা মুল বিষয় নয়, রোগীকে সুস্থ করাই মুল কাজ হয়ে থাকে।
এদিকে এক শ্রেণীর ডাক্তাররা রোগীদের গলায় ছুরি লাগিয়ে বসেন। এযেন রোগ সারাতে এসে নতুন রোগ চাপিয়ে দেওয়া। আমাদের সবার টাকা পয়সার চিন্তা বড় রোগ। ডাক্তাররা রোগীদের উপর টাকার বুঝা চাপিয়ে দেন। সামান্য কাশির জন্য ৪/৫ টি পরীক্ষা লিখে দেওয়া হয়। প্রথম ধাপে ডাক্তারের ভিজিট ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত হওয়ায় এই টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপে রোগ পরীক্ষা করার জন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রিপোর্টের বিল ১৫০০-৩০০০ টাকা দিতে হচ্ছে। তৃতীয় ধাপে ডাক্তার সাহেব রিপোর্ট দেখে বাংলাদেশের সুনামধন্য ৬/১০ টি কোম্পানির ঔষধ লিখে দিলেন। এখানে বিল আসলো আরো ২০০০-৪০০০ হাজার টাকা। চতুর্থ ধাপে একটু বেশি রোগ হলে ভর্তি দিয়ে দেন। যেখানে ভর্তি হবেন তাদের নির্দিষ্ট হাসপাতালের নাম লিখে দেন। ভর্তি হবার পর আবার বিভিন্ন টেস্ট করার জন্য লম্বা তালিকা করে দেন। তাও আবার তাদের নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হবে। তা নাহলে রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। চিকিৎসা শুরু হলো। ঔষধ কোম্পানি গুলো নতুন নতুন ঔষধ বাজারে ছেড়েছে। এই ঔষধ গুলো প্রথমে ডাক্তার পরীক্ষা করার জন্য রোগীদের প্রয়োগ করেন। এই ঔষধ রোগীদের প্রয়োগ করাতে পারলে একটি ভালো কমিশন পাওয়া যায়। আপনারা দেখবেন ডাক্তার প্রেসক্রিবশন করার পর বাহিরে অনেক ঔষধ কোম্পানির লোক আপনার প্রেসক্রিবশন দেখার জন্য অপেক্ষায় বসে থাকেন। অনেকে মোবাইল ফোনে ছবি তুলে নেন। অনেকেই বলে থাকেন ঐ ঔষধ কোম্পনির সাথে নাকি ডাক্তার সাহেবদের কমিশনের চুক্তি রয়েছে। তাই কোম্পানির লোক গুলো দেখছেন তাদের ঔষধ লিখেছেন কি না! হাসপাতালের সাথে ডাক্তারে চুক্তি থাকে, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চুক্তি থাকে। যত বেশি টেস্ট দিবে তত বেশী কমিশন বাড়বে। যত বেশি কোম্পানির ঔষধ লিখে দিবেন তত কমিশন বাড়বে। অনেক ডাক্তারের নিজস্ব ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল আছে। রোগীদের ওখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রোগী জাহান্নামে যাক এতে তাদের কিছু যায় আসে না। তাদের প্রয়োজন টাকা!
সরকারি হাসপাতালের অবস্থা আরো নাজেহাল। ওরা সরকারি ঔষধ রোগীদের ছোঁয়াবে না। ছোট কাগজে ঔষধের নাম লিখে দিয়ে দেন। নিজে বাহির থেকে কিনে আনতে হবে। কিন্তু গরিবের সরকারি ঔষধ কোথায় যায়? আজও কোন হদিস পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের কর্মকর্তাদের কে ঔষধের কথা বললে উত্তর আসে ‘ঔষধ শেষ হয়ে গেছে’। এই শব্দ প্রতিদিনের। যত দূর্নীতি সরকারি হাসপাতালে রয়েছে। সরকারি ডাক্তার দের ডিউটি হউক আর নাই হউক মাসের শেষে বেতন পাওয়া দরকার। সরকারি হাসপাতালে সঠিক সেবা দিলে বিকালে বাহিরে রোগী পাওয়া যাবে না। তাই সরকারি হাসপাতালে সঠিকভাবে চিকিৎসা দিতে অনেকেই নারাজ। প্রাইভেট ডাক্তারি করার মজাই আলাদা। প্রতিদিন বিকেল ৪ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত ৩০/৫০ জন রোগী দেখলে ১৫-২০ হাজার টাকা ইনকাম করা যাচ্ছে। হাসপাতালে চাকরি করে কি লাভ? একটি মাত্র লাভ আছে- ডাক্তারের নামের সাথে সরকারী হাসপাতালে নাম ব্যবহার করার সুবিধা আছে।
এদিকে মেডিক্যাল ছাত্রদের সাথে অন্য রকম চুক্তি থাকে। তাই মেডিক্যাল ছাত্রদের দিয়ে সার্জারি করান, তাদের দিয়ে রোগীদের ঔষধ প্রয়োগ করান। এর জন্য অনেক সময় ভূল চিকিৎসায় রোগী মারা যায়। অনেক হাসপাতালে নারীদের সিজার করেন পুরুষ ডাক্তার। আমরা রোগীর অভিভাবক ভিতরে গিয়ে দেখতে পারি না, পুরুষ ডাক্তার না মহিলা ডাক্তার।
বিরাট অংকের টাকার বিনিময়ে ডাক্তার হওয়ার কারণে এক শ্রেণীর ডাক্তার কসাই হয়ে গেছেন। রোগীদের রক্ত চুষে খাচ্ছেন। তাদের টাকার কাছে মানবতা অসহায়। রোগীরা সয় সম্বল বিক্রি করে টাকাগুলো কসাই ডাক্তারকে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। আর ডাক্তাররা রাতারাতি এই টাকা দিয়ে বিলাস বহুল গাড়ি, বাসা-বাড়ি, বেসরকারি হাসপাতাল তৈরি করছেন। বর্তমানে সবচেয়ে বড় বিবেক হীন হয়ে পড়েছেন অসাধু কিছু ডাক্তার। ওদের কাছে আজ ভালো ডাক্তাররাও অসহায়। ওদের কারণে ভালো মানের ডাক্তারগণের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। রোগীরা তো ডাক্তারের কাছে সারাজীবন অসহায় থাকবে। হাই পাওয়ারের এন্ট্রিবায়োটিক দিয়ে তারাতারি রোগ কমিয়ে নিজেকে ভালো ডাক্তার হিসাবে প্রমাণ করাতে চাওয়া কি ঠিক? এতে জীবনের জুকি রয়েছে। আমরা কোথায় যাবো। তাই গণপ্রজান্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদন করছি। ওদের হাত থেকে আমাদের বাঁচান।

লেখক: সাংবাদিক ও আহবায়ক, বাঁচাও বাসিয়া নদী ঐক্য পরিষদ।


Endofcontent
You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!