বিশ্বনাথের প্রথম অনলাইন পত্রিকা

কালের স্বাক্ষী ‘খাজাঞ্চী রেলওয়ে ব্রিজ’

মিজানুর রহমান মিজান :: বাংলাদেশ একটি নদী মাতৃক দেশ হিসাবে খ্যাত। আমরা যখন লেখাপড়া করি তখন বই পুস্তকেও তা পড়েছি। তবে বর্তমান অবস্থা দৃষ্টে মনে হচেছ নদীমাতৃক দেশ থেকে বাংলাদেশের অবস্থান সরে এসেছে। কারণ ভারত কর্তৃক ফারাক্কা বাঁধ ও টিপাইমুখ বাঁধ তৈরীর ফলে বাংলাদেশের নদীগুলি মৃতপ্রায়। হারিয়েছে তার জৌলুস, নাব্যতা এবং ভরাট হয়ে কমছে প্রশস্থতা ও গভীরতা। এক সময় নদীপথই ছিল বাংলাদেশের যোগাযোগের প্রধান ব্যবস্থা। অত:পর রেলপথ। সুতরাং সঙ্গত কারণেই সিলেট বিভাগের রেলপথের ইতিহাস জানা আবশ্য্যক।
১৮৯৬ সালে আসাম বেঙ্গল রেল লাইন কুলাউড়া হয়ে শিলচর পর্যন্ত যাতায়াত করতো। ১৯১২-১৯১৫ সাথে চালু হয় কুলাউড়া-সিলেট রেল লাইন। ১৯২৮ সাথে চালু হয় শায়েস্তাগঞ্জ-হবিগঞ্জ এবং ১৯২৯ সালে শায়েস্তাগঞ্জ-বাল্লা ও ১৯৫৪ সালে সিলেট-ছাতক রেল লাইন চালু হয়। (এ তথ্যটি আমি সিলেটের প্রখ্যাত লেখক সৈয়দ মোস্তফা কামাল এর ‘প্রসঙ্গ বিচিত্রা’ বই ও প্রবীন ব্যক্তিদের নিকট থেকে জ্ঞাত হয়েছি)। সুতরাং ১৯৫৪ সাল থেকে খাজাঞ্চী নদীর পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে খাজাঞ্চী নদীর উপর নির্মিত রেলওয়ে ব্রিজটি। তবে একবার এ ব্রিজটি আংশিক ভেঙ্গে পড়ায় কিছুদিন সাময়িক অসুবিধার সৃষ্টি হয়। কবে, কেন এবং কিভাবে ব্রিজটি ভাঙা হয়েছিল তা বর্তমান প্রজন্মকে অবহিত করণার্থে সে কথাও এখানে উল্লেখ করতে চাই ।
আমি তখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের শেষের দিকে এক রাত অনুমান ৩টা থেকে ৪টার দিকে বিকট শব্দে ভূকম্পনের মত ঘরদোর কেঁপে উঠে। কান তালাবদ্ধ হবার উপক্রম। গ্রামের মানুষজন ভয়ার্ত চিত্তে শুধু আল্লাহকে স্মরণ করছেন। বয়স্করা এবাড়ি ওবাড়ি যাতায়াত করছেন নির্জন নি:শব্দে। আলোহীন অন্ধকারে চলছেন সকলেই। ঘটনার আদ্যোপান্ত জানার আগ্রহে সবার। কি ভয়াল ও শংকিত প্রতিটি মানুষের হৃদয় মন। এই বুঝি পাক হানাদার বাহিনী আক্রমণ করল! গ্রাম ছেড়ে যাব কোথায়? আর না গিয়েই বা কি হবে? বাঁচতে তো হবে। বয়স্কদের চুপিচুপি কথাবার্তা শুনে তখন আমার কচি প্রাণ শুকিয়ে গিয়েছিল। যাই হোক আর কোন সাড়া শব্দ নেই। এক সময় মসজিদে ধ্বনিত হয় ফজরের নামাজের আযান। কাজকর্ম সকলেই ছেড়ে দিয়েছেন। একটাই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রাতের বেলা সংঘটিত শব্দের উৎস খোঁজে বের করা বা কোথায় কি হয়েছে তা অবগত হওয়া। সকাল আনুমানিক ৭/৮টার মধ্যে অবহিত হলাম খাজাঞ্চী নদীর উপর নির্মিত রেলওয়ে ব্রিজটি ভাঙ্গনের খবর। ব্রিজের পশ্চিম তীরের সম্পূর্ণ পিলারটি ভেঙ্গে ঐ স্থানে একটি মিনি পুকুরের মত হয়ে যায়। এ ভাঙ্গনে সম্পৃক্ত আছেন মুক্তিযোদ্ধারা। অর্থ্যাৎ পাক সেনাদের যোগাযোগ বিচিছন্ন করতে মুক্তিযোদ্ধারা ব্রিজটি ভাঙ্গেন। বিষয়টি জানার পর মানুষ অনেকটা আশ্বস্থ হন, একটু আলোর ঝিলিক ফুটে উঠে মন মননে। বাংলার দামাল ছেলেরা আসছে এগিয়ে। তারপর ও একদম নিশ্চিত নন। কখন কি ঘটে বলা যায় না। সর্বদা মানুষের মনে আতংক, শংকা ও উদ্বিগ্নতা।
বড়দের মুখ থেকে শুনতে পেলাম ব্রিজ ভেঙ্গে লোহার স্লিপার প্রায় এক কিলোমিটার দূরে কান্দিগ্রামে এসে পড়েছে। দেশ স্বাধীন হবার পর স্কুলে যাতায়াত কালে স্বচক্ষে দেখেছি এর বিভৎসতা। দীর্ঘ সম্পূর্ণ স্লিপারটি বেঁকে গিয়ে এতদুর এসে পড়েছে। শক্তিশালী বোমা ছিল বলে আমরা অনেক সময় বলাবলি করতাম সকল ক্লাসমিট মিলে। ভাঙ্গনের পর বেশ কিছুদিন ছাতক-সিলেট ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ ছিল। বোমার আঘাতে সৃষ্ট অত্যন্ত গভীর গর্ত ভরাট করে স্বাধীনতার পর রেল লাইনের নীচে যে কাঠের খন্ড থাকে তা একটির উপর একটি স্থাপন করে পিলার বানিয়ে অনেক দিন ট্রেন যোগাযোগ চলে। সর্বশেষ ১৯৭৬ সালে পুন:নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করে অদ্যাবধি ছাতক-সিলেট ট্রেন চলাচল অব্যাহত আছে খাজাঞ্চী নদীর উপর নির্মিত রেলওয়ে ব্রিজ দিয়ে। তাই কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে এই ব্রিজটি।

AFTER NEWS
You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.