সোমবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩০ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
সর্বশেষ সংবাদ
বিশ্বনাথে বিভিন্ন পূজা মন্ডপ পরিদর্শনে ইউএনও  » «   বিশ্বনাথে শিশু কন‌্যাকে অপহরণকালে জনতার হাতে আটক ১  » «   বিশ্বনাথে অজ্ঞাতনামা নারী হত্যা মামলা পুনঃতদন্তের জন্য ওসি’কে আদালতের নির্দেশ  » «   বিশ্বনাথে রামপাশা ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন সম্পন্ন  » «   স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য নির্বাচিত যমজ দুই ভাই মাফী ও শাফী  » «   আলোকিত দেশ গঠনে শেখ হাসিনার বিকল্প নেই – প্রতিমন্ত্রী মান্নান  » «   বিশ্বনাথে ট্রাক ড্রাইভারকে মারধর করার অভিযোগ : এমপির বিরুদ্ধে মিছিল-পাল্টা মিছিল  » «   বিশ্বনাথে প্রবাসীর উদ্যোগে হুইল চেয়ার ও সেফটি জ্যাকেট বিতরণ  » «   বিশ্বনাথে বিএনপি নেতা আব্দুল হাই গ্রেফতার  » «   বিশ্বনাথে পূজা মন্ডপে এমপি ইয়াহইয়া চৌধুরী সংবর্ধিত ও বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন  » «   পিস্তল’সহ বিশ্বনাথের যুবক গ্রেফতার  » «   বিশ্বনাথ ডেফোডিল এসোসিয়েশনের যুগপূর্তি অনুষ্ঠান সম্পন্ন  » «   শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখতে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর হস্তক্ষেপ কামনা করলেন মিরগাঁও গ্রামবাসী  » «   বিশ্বনাথের রামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন  » «   বিশ্বনাথে আইন-শৃংখলা কমিটির সভায় ‘ভূয়া সনদে শিক্ষক নিয়োগে’ নিন্দা প্রকাশ  » «  

বিশ্বনাথে কিশোরী হত‌্যার রহস‌্য উদঘাটন : মূল হত‌্যাকারী’সহ গ্রেফতার ৪

নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের পাঠাকইন গ্রামের জনৈক তবারক আলীর বাড়ির রাস্তা থেকে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতনামা কিশোরীর লাশের পরিচয় পাওয়া গেছে। নিহতের নাম রুমী আক্তার (১৬)। সে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানার আউতপাড়া গ্রামের আতাউর রহমানের মেয়ে।

এঘটনায় ঘাতক শফিক মিয়া (৩২) সহ ৪জনকে গ্রেফতার করেছে বিশ্বনাথ থানা পুলিশ। শফিক বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের মৃত ওয়াব উল্লাহ’র পুত্র। গ্রেফতারকৃত অন্যরা হলেন- শফিক মিয়ার স্ত্রী সোনালী আক্তার হিরা (২৪), তার দুই ভাবী দিপা বেগম (৩২) ও লাভলী বেগম (২৫)।

শফিককে বিভিন্ন পর্যায়ে সহায়তাকারী ও সন্দেহভাজন হিসাবে মোট ১৪জনকে পুলিশ হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত শফিক মিয়া কিশোরী রুমী আক্তারকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুরস্থ হাসপাতাল থেকে পালিয়ে এনে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করেছে।

বুধবার দুপুরে সিলেট পুলিশ সুপার হল রুমে পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান পিপিএম ও বেলা ২টায় বিশ্বনাথ থানায় প্রেস কনফারেন্সে ওসি শামসুদ্দোহা পিপিএম এমন তথ্য জানান।

পুলিশ ও খুন হওয়া কিশোরী রুমীর আত্মীয়-স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, ‘থেলাসেমিয়া রোগে’ আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানার কুমুদিনী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে রুমী আক্তার। রুমীর পাশের বেডেই চিকিৎসাধীন ছিলেন ঘাতক শফিকের আরেক শাশুড়ী। আর গত ৪ সেপ্টেম্বর শাশুড়ীর চিকিৎসার খোঁজ-খবর নিতে গিয়েই রুমী আক্তারের সাথে পরিচয় হয় লম্পট শফিক মিয়ার। আর এই পরিচয় থেকেই শফিকের প্রেমের ফাঁদে পড়েন রুমি আক্তার।

এরপর বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ৯ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫.১১ মিনিটের কুমুদিনী হাসপাতাল থেকে নিয়ে বের হয়ে রুমী বেগমকে সাথে নিয়ে ১০ সেপ্টেম্বর ভোরে নিজ বাড়িতে উঠেন শফিক মিয়া। ছোট ভাবী লাভলী বেগম ঘরের দরজা খুলে তাদেরকে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করতে দেন। বিশ্বনাথে আসার পর শফিকের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ দেখে রুমী চটপট করতে থাকে। এসময় শফিক রুমীর মুখ-হাত বেঁধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। এরপর পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিলেও শফিকের চিন্তাভাবনায় ছিল অন্য বিষয়। তাই আরোও কয়েকবার সে (শফিক) রুমীকে ধর্ষণ করে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে হাত-পা বেঁধে নিজেদের বসত ঘরের পিছনে থাকা খালে ডুবিয়ে রুমীকে শফিক হত্যা করে এবং সন্ধ্যার পর রুমীর মরদেহটি স্থানীয় তবারক আলীর বাড়ির রাস্তায় রেখে সে (শফিক) পালিয়ে প্রথমে ছাতকে থাকা নিজের বোনের বাড়িতে যায়, এরপর সে পুনরায় টাঙ্গাইলের মির্জাপুরেস্থ নিজ কর্মস্থল ‘নাসির গ্লাস ফ‌্যাক্টরীতে চলে যায়।

অন্যদিকে শফিক যে রুমীর হাত-পা বেঁধে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে খুন করেছে ও ঘরের ভিতরে আসার পর মুখ-হাত বেঁধে রুমীকে নির্যাতন করেছে তার (শফিক) দুই ভাবী দেখেও (দিপা ও লাভলী) শফিককে কোন প্রকারের বাঁধা দেননি, এমনকি কাউকে কিছু না বলেই বিষয়টি গোপন করে গেছেন। শফিক’সহ তারা (দিপা ও লাভলী) এঘটনায় অন্য কাউকে ফাঁসিয়ে দিয়ে শফিককে বাঁচানোর চেষ্ঠা করছিলেন।

এদিকে বোন হাসপাতাল থেকে হারিয়ে গেছে মর্মে ১০ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানায় কিশোরী রুমী আক্তারের ভাই শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে একটি সাধারণ ডায়েরী দায়ের করে। ডায়েরী নং ৪০১ (তাং ১০.০৯.১৮ইং)।

বিশ্বনাথ থানা পুলিশের তদন্ত চলাকালে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানার কুমুদিনী হাসপাতাল হতে চিকিৎসাধীন একটি মেয়ে নিখোঁজ রয়েছে জানতে পেরে নিখোঁজ হওয়া মেয়েটির পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হয়। যোগাযোগের একপর্যায়ে পরিধেয় কাপড় চোপড় ও পেটের পুরাতন অপারেশন পর্যালোচনায় ঐ নিখোঁজ মেয়েই বিশ্বনাথের পাঠাকইন গ্রামে পাওয়া অজ্ঞাতনামা মেয়ের লাশ হিসেবে বিশ্বনাথ থানা পুলিশ নিশ্চিত হয়।

গত ১০ জুলাই রাত প্রায় ১২টায় সিআইডির ক্রাইমসি ও পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আলামত সংগ্রহ শেষে লাশ উদ্ধারের পর সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুতের সময় লাশের শরীরে পুরাতন একটি বড় অপারেশনের চিহ্ন দেখা যায়। এছাড়া সাদা গেঞ্জির চিকন টুকরা কাপড় দ্বারা উক্ত লাশটির দুই হাত পিছন দিকে পিঠের উপরে বাধা ও উপুর অবস্থায় লাশটি পড়ে থাকতে দেখা যায়। লাশের গলায় পেচানো ওড়নার দুই পাশের দুই মাথায় পলিথিন দ্বারা মোড়ানো সাদা কাগজে লেখা দুইটি একই নম্বরের মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়। ঐ নাম্বারের সূত্রধরে তদন্তের একপর্যায়ে গত ১৪ সেপ্টেম্বর একটি বাংলালিংক নম্বর হতে লাশের সাথে পাওয়া নম্বরের ব্যক্তিকে গ্রেফতার করলে সকল তথ্য উদঘাটিত হবে বলে বিশ্বনাথ থানার অফিসার ইন-চার্জকে জানালে তাৎণিক বাংলালিংকের ঐ নম্বর সনাক্ত করে প্রযুক্তিগত সহায়তায় ঐ ব্যক্তির অবস্থান নিশ্চিত করা হয়।

আসামী গ্রেফতারের জন্য অনুরোধ করা বাংলালিংকের নম্বর পর্যালোচনায় দেখা যায় উক্ত নম্বরের সাথে বিশ্বনাথের আশুগঞ্জ বাজারের জনৈক ইমরান আহমেদ রিয়াদ কয়েক দফায় যোগাযোগ করে এবং বাংলালিংকের উক্ত নম্বরটি বিশ্বনাথ থানার অফিসার ইনচার্জের সাথে যোগাযোগ করে। ফলে এতে প্রমাণিত হয় যে, বিশ্বনাথের রামচন্দ্রপুর গ্রামের ইমরান আহমেদ রিয়াদের সাথে বাংলালিংকের গ্রাহকের কোন না কোনভাবে পরিচয় রয়েছে। ইমরানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যথারীতি থানায় আনা হলে প্রাপ্ত নাম্বারসমূহ বিশ্লেষণে পুলিশ জানতে পারে বাংলালিংক নাম্বারসহ নিহত রুমী আক্তারের সাথে যোগাযোগকারী অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিটি বিশ্বনাথের রামচন্দ্রপুর গ্রামের জনৈক শফিক মিয়া। সে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানার নাছির গ্লাস ফ্যাক্টরীতে চাকুরী করে এবং ওই ফ্যাক্টরীর কর্মরত এক মহিলার সাথেও সে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে। উক্ত মহিলার শরনাপন্ন হলে তার দেওয়া তথ্যমতে শফিক মিয়াকে ১৮ সেপ্টেম্বর ভোর ৬ টায় নাছির গ্লাস ফ্যাক্টরী থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত তার মোবাইল ফোনের সন্ধান দেয়। পরবর্ততে শফিক মিয়ার দেওয়া তথ্যমতে ওসি’কে ফোন করে হত্যাকান্ডেকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকায় সফিক মিয়ার স্ত্রী সোনালী আক্তার হিরা’কে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় গাজীপুর জেলার চৌরাস্তা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

প্রেস ব্রিফিং-এ ওসি আরো জানান, গ্রেফতারকৃত শফিক মিয়া একজন নারী পিপাসু ও লম্পট প্রকৃতির লোক। সে মোট ৮টি বিয়ে করেছে। বর্তমানে সে ৪ জন স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছে। একটি গণধর্ষণ মামলার প্রলাতক আসামী হয়ে সে দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে থেকে সবার অগোচরে নিরীহ মেয়েদেরকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে একের পর এক হত্যা ও ধর্ষণ করে বেড়ায় এবং হত্যার পর নিরীহ লোকদের ফাঁসিয়ে নিজে আত্মরক্ষার অপচেষ্টা করে। এরই ধারাবাহিকতায় রুমী আক্তার তার প্রেমের ফাঁদে পা দিয়ে প্রাণ হারায়।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে ২২ এপ্রিল একই স্থানে আনুমানিক ২৮ বছর বয়সী অজ্ঞাতনামা এক নারীর লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। ওই নারীর বুকের কাপড়ের নিচে ভ্যানিটি ব্যাগের ভিতরে একইভাবে পলিথিন দ্বারা মোড়ানো দুই ব্যক্তির ছবি পাওয়া গিয়েছিল।

এদিকে, গতকাল বুধবার বিকেলে গ্রেফতারকৃত শফিক মিয়াকে নিয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এসময় এলাকার শত শত জনতা ঘাতক শফিকের ফাঁসির দাবি জানান।

am-accountancy-services-bbb-1

সর্বশেষ সংবাদ